স্টাফ রিপোর্টার::
একসময় বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার অন্যতম পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ফতেপুর মুরারিচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়। শতবর্ষের ঐতিহ্য বহনকারী এই বিদ্যালয়ে কয়েক বছর আগেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ভাতা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক হিসাব নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয় অভিভাবকের লিখিত অভিযোগ, শিক্ষকদের বক্তব্য এবং জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পরিদর্শনের পর বিদ্যালয়টির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে বিদ্যালয়ের আয় ব্যয়ের হিসাব এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে ক্রীড়া বিষয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ আলী নূরের দায়িত্ব পালন নিয়ে। স্থানীয় অভিভাবক মন্টু দাস গত ৯ সেপ্টেম্বর (বুধবার) জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন খাতের আয় ও ব্যাংক হিসাবে জমার তথ্য তুলে ধরে তিনি আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অভিযোগে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সেশন ফি বাবদ আয় হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন খাত থেকে আয় হয়েছে ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৫০০ টাকা। বিদ্যালয়ের জমি ও অন্যান্য উৎস থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা আয় হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৬০ টাকা এবং ২০২৬ সালে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা অভিযোগে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ উল্লিখিত মোট অর্থের বিপরীতে ব্যাংকে জমা দেওয়া অর্থ বাদ দিলে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৪৪০ টাকার হিসাব সামনে আসে। তবে এই অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়ম হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ক্যাশবুক, রশিদ বই, ভাউচার, আয় ব্যয়ের বিবরণী, উত্তোলনের কাগজপত্র এবং হাতে থাকা নগদ অর্থসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো এই ৭ লাখ ৭২ হাজার ৪৪০ টাকার অবস্থান কোথায়? বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক পবিত্র ভূষণ তালুকদারের দাবি, শিক্ষক কর্মচারীরা প্রায় ৩৫ মাস ধরে বিদ্যালয়ের ফান্ড থেকে পাওনা বেসরকারি অংশের বেতন ভাতা, বোনাস ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ পাচ্ছেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্ট সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষকদের প্রাপ্য ২০ শতাংশ বেতন বিদ্যালয়ের ফান্ড থেকে দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে সেই অর্থ আর পরিশোধ করা হয়নি। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন আদায়ের পদ্ধতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। পবিত্র ভূষণ তালুকদারের দাবি, ২০২৪ সালে রশিদ ছাড়া বেতন নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে রশিদের মাধ্যমে বেতন আদায় করা হলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আবারও রশিদ ছাড়া বেতন আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের রশিদ বই, শিক্ষার্থীদের বেতন রেজিস্টার, ক্যাশবুক ও ব্যাংক হিসাব পাশাপাশি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষকরা। বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও ক্রীড়া বিষয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ আলী নূর কীভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পেলেন এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও কয়েকজন শিক্ষক। এমপিও নীতিমালা-২০২৫ এর সংশ্লিষ্ট বিধানে প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নির্ধারিত জ্যেষ্ঠতা ও দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা রয়েছে। ফলে নূর আলীকে দায়িত্ব দেওয়ার সময় জ্যেষ্ঠতার তালিকা, দায়িত্ব হস্তান্তরের লিখিত আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সঞ্জীবন রায় বলেন, জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা কর্মরত থাকা অবস্থায় একজন জুনিয়র শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নথিপত্র দেখে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের আয় ব্যয়, শিক্ষক কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও ভর্তি রেজিস্টার নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর উত্তর নথিপত্র যাচাই করলেই পাওয়া যাবে। তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও ক্রীড়া শিক্ষক মোহাম্মদ আলী নূর বলেন, তার আগে প্রধান শিক্ষক পদে সিনিয়র শিক্ষক পবিত্র ভূষণ তালুকদার ছিলেন। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের পর সহকারী শিক্ষক সঞ্জীবন রায় প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী পদে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে সাময়িক এবং পরে চূড়ান্ত বরখাস্ত করেন বিগত ম্যানেজিং কমিটি। এরপর ম্যানেজিং কমিটি তাকে দায়িত্ব দিয়েছে দাবি করে নূর আলী বলেন, তিনি বৈধভাবেই দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নিয়মিত ক্লাস নেন এবং বাইরে কোথাও গেলে অন্য শিক্ষকদের জানিয়ে যান বলেও দাবি করেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর দাবি, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেন না এবং সময়মতো বিদ্যালয়ে আসেন না। তার ভাষ্য, দুপুর ১টার পর প্রায়ই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অফিস কক্ষ তালাবদ্ধ থাকে। অভিযোগ পাওয়ার পর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার হোসেন বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি স¤পর্কে তথ্য নেন। পরিদর্শন শেষে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ও একাডেমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকায় উপজেলার ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তদারকি করা যাচ্ছে না। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নূর আলীকে অভিযোগের বিষয়ে লিখিত জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জুলফিকার হোসেন আরও বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ে এডহক কমিটি না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এডহক কমিটি গঠনের পর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের খসড়া ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হবে। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর নির্বাচনের মাধ্যমে ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হবে। সেই কমিটির মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ মোৱট ছয়টি পদ শূন্য রয়েছে। এনটিআরসির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং শূন্য থাকা সহকারী শিক্ষক পদগুলো দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কয়েকটি শূন্য পদও কমিটির মাধ্যমে পূরণের চেষ্টা করা হবে। শতবর্ষী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন অভিযোগ প্রতিঅভিযোগের বাইরে গিয়ে নথিপত্রের নিরীক্ষাই হতে পারে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের সবচেয়ে কার্যকর পথ। বিশেষ করে ১৪ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ টাকা আয়, উত্তোলনের বিপরীতে ব্যাংকে জমা দেওয়া অর্থ বাদে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৪৪০ টাকার হিসাব, ৩৫ মাসের বেতন ভাতা বকেয়া, রশিদ ছাড়া বেতন আদায়ের অভিযোগ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রতিটি বিষয় পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের রশিদ বই, ক্যাশবুক, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভাউচার, আয় ব্যয়ের হিসাব, বেতন রেজিস্টার, ভর্তি রেজিস্টার এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের নথি পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র ¯পষ্ট হতে পারে। শিক্ষার্থী শিক্ষকদের স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক নজরদারি, নথিপত্র যাচাই এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় দায়িত্ব নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও এলাকাবাসী।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
মুরারিচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ, শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা
- আপলোড সময় : ১২-০৯-২০২৬ ০১:৫৪:৪৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১২-০৯-২০২৬ ০১:৫৫:৪২ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ